বাঙলার স্বাধীনতা সূর্য অস্ত যায় ১৭৫৭ সালে। এর ঠিক ৭৫ বছর আগের একটা ঘটনা আপনাদের বলি।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর এর নাম ছিল উইলিয়াম হেজেস। কোম্পানির একটা কর্মাশিয়াল ডিসপিউটের কেইস নিয়ে উনার সাথে বাঙলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁর দেখা হয়েছিল।
এটা ১৬৮০ এর দিকের কথা। কলকাতা থেকে তখনকার রাজধানী ঢাকায় আসার পর ২ মাস অপেক্ষা করে হেজেস শায়েস্তা খার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছিলেন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার পর নায়েবে নাজিমের সাথে উইলিয়াম হেজেস লালবাগ কেল্লায় যান। দরবার ই আমে দেখা হওয়ার পর শায়েস্তা খা ডিসপিউটের আলাপ দূরে সরিয়ে রাখেন। তার বদলে কোম্পানির গভর্নরকে জেরা করতে শুরু করেন।
আধ ঘন্টা ধরে সওয়াল জওয়াব চলতে থাকে। শায়েস্তা খার প্রশ্নগুলা ছিল খুবই শার্প আর স্ট্র্যাটেজিক। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির টার্ন ওভার কত, লন্ডন থেকে ঢাকায় আসতে কয়দিন লাগে, বাঙ্গাল মুলুকে এখন কয়জন ইংরেজ বাস করে, ট্যাক্স আর কাস্টমসের সিলিং কত, মোঘল সাম্রাজ্য থেকে রেমিটেন্স পাঠিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিসহ অন্যান্য কম্পানিগুলো অর্থপাচার করছে কিনা, মাদ্রিদ – ফ্লোরেন্স – লন্ডন – আমস্টারড্যামের শহরগুলো মোঘল সাম্রাজ্যের টাকা পয়সা বাণিজ্য করে ওদের সেন্ট্রাল রিজার্ভ বাড়াচ্ছে কিনা ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর জানতে চান।
জিজ্ঞেস করেন হেজেস আগে টার্কি আর আরব দেশে গেছেন কিনা, সেখানকার ভাষা জানেন কিনা।
হেজেস যখন বললো হ্যা ভাষা জানি, শায়েস্তা খা ছাড়ার পাত্র না। মুন্সিদেরকে ডেকে এনে সাথে সাথে হেজেসের অ্যারাবিক পরীক্ষা নিলেন। হেজেস পাশ করলেন।
যে সময়ের কথা বলছি সেটা সম্রাট আওরঙ্গজেবের মোঘল সাম্রাজ্য। পৃথিবীর ৫টা বড় সাম্রাজ্যের একটা।
সেই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় প্রদেশের, সবচেয়ে সম্পদশালী প্রদেশের সুবেদার একজন সামান্য ইংরেজ ব্যবসায়ীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করছেন।
আপনি শায়েস্তার কৌতুহলের লেভেলটা চিন্তা করেন।
বাট সরি এখন আপনার অনুভূতিতে আঘাত দিবো। আপনাকে এখন শায়েস্তা খার কৌতুহলের সাথে উইলিয়াম হেজেসের কৌতুহলের তুলনা করতে বলবো।
কে বেশি কৌতুহলী?
হেজেস না শায়েস্তা?
শায়েস্তা খাঁ জানতে চাচ্ছেন যে বার্লিনের অবস্থা কী, মাদ্রিদের অবস্থা কী? আর এদিকে হেজেস ঢাকার খবর জানতে নিজেই লন্ডন থেকে ঢাকায় চলে এসেছেন।
শায়েস্তা ফার্সিতে প্রশ্ন করে জানতে চাচ্ছেন হেজেস আরবি জানে কিনা। আর এদিকে হেজেস নিজেই আরবি ফার্সি শিখে বসে আছে।
এই মিটিং এর ঠিক ৭৫ বছর পর ১৭৫৭ সালে - আধিপত্য বিস্তারে শায়েস্তা খাঁরা এগিয়ে থাকবে নাকি ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি - সেই প্রশ্নের উত্তর সেই দিনই নির্ধারিত হয়ে গেছে।
সুলতানী মুঘল নবাবী আমলে বাঙলাদেশে পর্তুগিজ, ইংরেজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, গ্রিকরা এসেছিল। কিন্তু বাঙালি জাতির কখনো কৌতুহল হয় নাই যে একটু পর্তুগাল যাই। সুলতান-নবাব-সুবেদার-জমিদারদের কখনো জানার কৌতুহল হয় নাই যে সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে কেমন লাগে, তারা সমুদ্র বাণিজ্য, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপের সাথে ব্যবসা এগুলা করা এক্সপ্লোর করতে চান নাই। লন্ডনে কোন মুঘল বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয় নাই।
মুঘল বা নবাবদের কোন নৌ বাহিনীও ছিল না। নদী বাহিনী ছিল।
কিন্তু সমদ্রসীমা পাহাড়া দেওয়ার কিছু ছিল না। ১২০০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে সমুদ্রে যাতায়াত করার অভ্যাস না থাকায় বাঙালিদের কোন ন্যাভিগেশন স্কিল ডেভলপ করেনি। এর মানে তারা গাণিতিক মানচিত্র আঁকতে পারতো না। তারা সবকিছু আনুভূমিকভাবে দেখতো। আগ্রা ডানে, কান্দাহার বামে, মহীশূর দক্ষিণে এভাবে দেখতো। তাদের পাখির চোখ ছিল না। তারা সবকিছু উপর থেকে মানচিত্রের মত করে দেখতেই পারতো না। পুরো চিন্তা কাঠামোটাই ডিফারেন্ট।
সমুদ্রে বিচরণ না থাকায় তারা সমুদ্রের রুটগুলাকে করের আওতায় আনতে পারেনাই। তাদের সব রেভেন্যু আসতো ল্যান্ড থেকে। একটা ল্যান্ড বেইজড নেশন। সম্পদ, রেভেন্যু, ট্যাক্স বলতে সে বুঝে জমি। সে সমুদ্র বুঝে না।
শায়েস্তা খাঁর সময়েরও প্রায় দেড়শো বছর আগের কথা।
বাঙলার সুলতান ছিলেন হোসেন শাহ। ঐ সময় মালয়েশিয়াতে একজন পর্তুগিজ ডিপ্লোম্যাট ছিলেন। নাম টম পায়ার্স। ১৫১৫ সালে পায়ার্স একটা বই লেখেন। এখন বইয়ের নাম ভুলে গেছি। বইতে উনি বলেন, এখানে আসা সব বাঙালি বণিক বাটপার। মালয়েশিয়ার বন্দরগুলাতে কাওকে প্রতারক গালি দিতে লোকজন 'বাঙালি' শব্দটা ব্যবহার করা হয়। প্রতারক হলেও বাঙালিদের রসবোধ অত্যন্ত প্রখর।
পায়ার্স আরও লেখেন যে, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ চালানো, ন্যাভিগেশন, বাণিজ্য ইত্যাদিতে পারদর্শী হলো গুজরাটি আর তামিলরা। এদের সাথে বাঙালিদের কোন তুলনা হয় না। বাঙালিরা তামিল বা গুজরাটিদের জাহাজে চেপে ছোট ছোট ট্রেড করে।
বাঙালি ব্যবসায়ীরা পায়ার্সকে জানান যে বাঙাল মুলকে সি ট্রেডের ভালো পরিবেশ নাই। সুলতান হোসেন শাহ বণিকদের কোন সাহায্য করেন না। বন্দরে ভালো সুবিধা নাই। উলটো চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত মালামাল নিতে অন্তত ১৫ জায়গায় খাজনা আর চান্দা দিতে হয়। ট্যাক্স আর কাস্টমসের কোন গোছানো ব্যবস্থা নাই। যে যেমনে পারে চান্দা আদায় করে।
48 · Messageবাঙলার স্বাধীনতা সূর্য অস্ত যায় ১৭৫৭ সালে। এর ঠিক ৭৫ বছর আগের একটা ঘটনা আপনাদের বলি।
5 October 2026Nearby in the feed
Wthis message
W